বিজ্ঞানের নতুন ইতিহাস, ল্যাবরেটরিতে তৈরি হলো কৃত্রিম কোষ যা প্রাকৃতিকভাবেই বংশবৃদ্ধি করতে সক্ষম
চিকিৎসা ও জীববিজ্ঞানের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী মাইলফলক স্পর্শ করে বিশ্বের প্রথম এমন এক কৃত্রিম বা সিন্থেটিক কোষ উদ্ভাবন করেছেন বিজ্ঞানীরা, যা সাধারণ প্রাকৃতিক কোষের মতোই নিজে থেকে বৃদ্ধি পেতে এবং বিভাজিত বা বংশবৃদ্ধি করতে পারে।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভূতপূর্ব অগ্রগতির হাত ধরে এক অবিশ্বাস্য সাফল্যের সাক্ষী হলো গোটা বিশ্ব। কৃত্রিম উপায়ে ল্যাবরেটরিতে কৃত্রিম জীবন বা কোষ তৈরির চেষ্টা গবেষকেরা দীর্ঘদিন ধরেই করছেন। তবে অতীতের সমস্ত রেকর্ড ভেঙে এবার সম্পূর্ণ ল্যাবরেটরিতে তৈরি এক বিশেষ সিন্থেটিক কোষের সফল বংশবৃদ্ধি ও স্বাভাবিক বিভাজন প্রক্রিয়া দেখতে সক্ষম হয়েছেন জিন প্রকৌশলীরা। দীর্ঘ মেয়াদী এই গবেষণার সফল সমাপ্তি আগামী দিনে চিকিৎসা বিজ্ঞান, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চালিত বায়ো-ডিজাইন এবং জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ক্ষেত্রে এক নতুন দিগন্তের উন্মোচন করবে বলে মনে করা হচ্ছে।
বিজ্ঞানীদের দীর্ঘ লড়াই ও সিন্থেটিক কোষের গঠন যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষস্থানীয় ল্যাবরেটরির একদল জিন বিজ্ঞানী ও গবেষকদের যৌথ প্রচেষ্টায় এই জটিল গবেষণাটি সম্পন্ন হয়েছে। বিজ্ঞানীরা মূলত একটি অতি ক্ষুদ্র এককোষী ব্যাকটেরিয়ার জিনোম থেকে সমস্ত অপ্রয়োজনীয় উপাদান বাদ দিয়ে একটি ‘মিনিমাল সেল’ বা ন্যূনতম কোষ তৈরি করেছিলেন। এই গবেষণার মূল চ্যালেঞ্জ ছিল এমন একটি কোষ তৈরি করা যা কেবল জীবিতই থাকবে না, বরং সাধারণ কোষের মতো ভারসাম্যপূর্ণভাবে বৃদ্ধি পাবে। এর আগের সংস্করণের কৃত্রিম কোষগুলো বিভাজিত হওয়ার সময় অস্বাভাবিক ও অদ্ভুত আকৃতি ধারণ করত। কিন্তু নতুন জিনগত পরিবর্তনের মাধ্যমে এবার সেই খামতি দূর করা সম্ভব হয়েছে।
স্বাভাবিক বিভাজন ও বংশবৃদ্ধির পেছনের রহস্য গবেষকেরা দীর্ঘ গবেষণার পর জানতে পেরেছেন যে, কোষের স্বাভাবিক ও সুষম বিভাজনের জন্য নির্দিষ্ট কিছু জিনের উপস্থিতি বাধ্যতামূলক। নতুন এই সিন্থেটিক কোষে সাধারণ ১৯টি জিনের পাশাপাশি অতিরিক্ত ৭টি বিশেষ জিন যুক্ত করা হয়েছে, যা কোষটির সুষম ও স্বাভাবিক বিভাজনে মূল ভূমিকা পালন করে। নতুন এই কোষটি যখন ল্যাবরেটরির নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে সংখ্যাবৃদ্ধি করতে শুরু করে, তখন দেখা যায় যে এর প্রতিটি নতুন কোষ হুবহু আদি কোষের মতোই গোল এবং সমান আকৃতির হচ্ছে। কোষের ভেতরের এই জটিল জিনগত বিন্যাস সঠিকভাবে বুঝতে পারাটাই বিজ্ঞানীদের এই প্রকল্পের সবচেয়ে বড় সাফল্য।
ভবিষ্যৎ চিকিৎসা বিজ্ঞান ও ওষুধের নতুন দিগন্ত এই আবিষ্কারের সুদূরপ্রসারী অর্থনৈতিক ও চিকিৎসাগত সম্ভাবনা রয়েছে। বিজ্ঞানীরা আশাবাদী যে, এই কৃত্রিম কোষের প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে ভবিষ্যতে মানবদেহের জন্য অত্যন্ত কার্যকরী এবং সুনির্দিষ্ট ওষুধ বা অ্যান্টিবায়োটিক তৈরি করা সম্ভব হবে। এ ছাড়া পরিবেশ দূষণ রোধে সক্ষম কৃত্রিম ব্যাকটেরিয়া তৈরি কিংবা নির্দিষ্ট ক্যানসার কোষকে ধ্বংস করার মতো বায়ো-ডিজাইন তৈরিতেও এই সিন্থেটিক সেল প্রযুক্তি বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে পারে। তবে কৃত্রিম জীবন তৈরির এই বৈজ্ঞানিক অগ্রগতির সমান্তরালে জৈব-নিরাপত্তা ও নৈতিকতার বিষয়টিও আন্তর্জাতিক গবেষক মহলে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।