মহাকাশে বিশাল আয়না বসানোর অনুমোদন দিল এফসিসি, তীব্র প্রতিবাদের মুখেও মার্কিন স্টার্টআপের পরীক্ষা
তীব্র আপত্তি ও প্রতিবাদের মুখেও যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল কমিউনিকেশনস কমিশন (এফসিসি) ক্যালিফোর্নিয়ার একটি স্টার্টআপ কোম্পানিকে মহাকাশে বিশাল আয়না বসিয়ে রাতে পৃথিবীর অন্ধকার অংশে সূর্যের আলো প্রতিফলিত করার পরীক্ষামূলক অনুমোদন দিয়েছে।
রাতের অন্ধকার আকাশকে কৃত্রিমভাবে আলোকিত করার এক বিতর্কিত প্রযুক্তির প্রাথমিক অনুমোদন দিয়েছে মার্কিন নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফেডারেল কমিউনিকেশনস কমিশন (এফসিসি)। ক্যালিফোর্নিয়ার হথর্নভিত্তিক স্টার্টআপ কোম্পানি ‘রিফ্লেক্ট অরবিটাল’ (Reflect Orbital) তাদের ‘ইয়ারেন্দিল-১’ (Eärendil-1) নামক স্যাটেলাইটটি পৃথিবীর নিম্ন কক্ষপথে উৎক্ষেপণের অনুমতি পেয়েছে। এই স্যাটেলাইটে একটি ৬০ ফুট চওড়া পাতলা এবং অত্যন্ত প্রতিফলক আয়না বা রিফ্লেক্টর থাকবে, যা রাতের বেলা নির্দিষ্ট কোনো শহরের রাস্তা, উদ্ধারকাজ কিংবা সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রে অন-ডিমান্ড সূর্যের আলো সরবরাহ করতে পারবে। তবে পরিবেশবিদ ও বিজ্ঞানীদের তীব্র প্রতিবাদের মধ্যেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
তীব্র প্রতিবাদ ও বিজ্ঞানীদের উদ্বেগ
এফসিসি-র এই অনুমোদনের পর জ্যোতির্বিজ্ঞানী, বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞ এবং পরিবেশবাদীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, রাতের আকাশে এমন তীব্র আলোর প্রতিফলন উড়োজাহাজের পাইলটদের বিভ্রান্ত করতে পারে এবং গভীর মহাকাশ পর্যবেক্ষণে নিয়োজিত জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের গবেষণাকে সম্পূর্ণ বাধাগ্রস্ত করবে। নর্থওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটির নিউরোবায়োলজির গবেষকদের মতে, কৃত্রিম এই আলো প্রকৃতিতে উদ্ভিদ ও প্রাণীদের ‘সার্কাডিয়ান রিদম’ বা স্বাভাবিক জৈবিক ঘড়িকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করবে। নিশাচর প্রাণীদের জীবনযাত্রা বিঘ্নিত হওয়া ছাড়াও পরাগায়নকারী পতঙ্গ এবং পরিযায়ী পাখিরা এর ফলে দিকভ্রান্ত হতে পারে।
এফসিসি-র আইনি অবস্থান ও সীমাবদ্ধতা
নিয়ন্ত্রক সংস্থা এফসিসি তাদের আদেশে স্পষ্ট করেছে যে, তারা কেবল একটি মাত্র ‘ডেমোনেস্ট্রেশন স্যাটেলাইট’ বা পরীক্ষামূলক উপগ্রহের জন্য রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি ব্যবহারের অনুমোদন দিয়েছে, যা মার্কিন মহাকাশ গবেষণার নেতৃত্বকে এগিয়ে নেবে। এফসিসি আরও জানিয়েছে, এই আয়নার কারণে পৃথিবীর পরিবেশে বা বন্যপ্রাণীর ওপর কী ধরনের ক্ষতিকর প্রভাব পড়তে পারে, তা খতিয়ে দেখা তাদের আইনি এক্তিয়ারের মধ্যে পড়ে না। তাদের মূল কাজ কেবল স্যাটেলাইটের যোগাযোগ ব্যবস্থা যেন অন্য সিগন্যালে হস্তক্ষেপ না করে এবং মেয়াদ শেষে সেটি যেন নিরাপদে ধ্বংস হয়ে যায় তা নিশ্চিত করা। পরিবেশগত পর্যালোচনার এই আইনি শূন্যতা নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হচ্ছে।
ভবিষ্যতের লক্ষ্য এবং ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
রিফ্লেক্ট অরবিটাল-এর বাণিজ্যিক পরিকল্পনা অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী। ২০২৬ সালের এই একটি পরীক্ষামূলক স্যাটেলাইটের পর তারা ২০২৮ সালের মধ্যে ১,০০০ এবং ২০৩৫ সালের মধ্যে প্রায় ৫০,০০০ আয়না মহাকাশে পাঠানোর পরিকল্পনা করছে, যা গ্রাহকদের চাহিদামতো আলো বিক্রি করবে। তবে মোনাশ ইউনিভার্সিটির জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের হিসাব অনুযায়ী, টেরিস্ট্রিয়াল ব্যাটারি প্রযুক্তির চেয়ে এটি অনেক বেশি ব্যয়বহুল এবং মাত্র ২০ শতাংশ দুপুরের আলোর সমতুল্য আলো তৈরি করতেও হাজার হাজার স্যাটেলাইটের প্রয়োজন হবে। এর আগে ১৯৯৩ সালে রাশিয়া ‘জনামিয়া ২’ (Znamya 2) নামক একটি ৮০ ফুট চওড়া মহাকাশ আয়না দিয়ে সাইবেরিয়ায় আলো ফেলার সংক্ষিপ্ত পরীক্ষা চালিয়েছিল, তবে পরবর্তী পরীক্ষা ব্যর্থ হওয়ায় তারা প্রকল্পটি বন্ধ করে দেয়।