হৈ হৈ করে ক্যানসার ডেকে আনছে মানুষ জানেন কি?

|

সিগারেট প্যাকেটের ৮৫% জায়গা জুড়ে ছাপতে হবে ক্যানসার হবার বিধিসম্মত সতর্কীকরণ এবং ক্যানসারে আক্রান্ত হবার ছবি। যাতে সিগারেট কেনার সময়ে সাধারণ মানুষ সেই বীভৎস ক্যানসার আক্রান্ত হবার ছবি সহ লেখা পড়ে সিগারেট খাওয়া থেকে বিরত থাকে।এখন বাজারে ‘তামাক সেবনের’ অপকারিতা নিয়ে কিছু তথ্য অনুসন্ধান করা যাক

তামাক প্রধানত দু’ধরনের –ধোঁয়াহীন ও স-ধূম। ধোঁয়াবিহীন তামাকের মধ্যে রয়েছে খৈনি শুটকা, জর্দা, পানমশলা, নস্যি, পানপরাগ, তিরঙ্গা ইত্যাদি। ধোঁয়াযুক্ত তামাকের মধ্যে রয়েছে বিড়ি, সিগারেট, সিগার, চুরট, ছিলিম, হুঁকো, চোটা ইত্যাদি। চিবিয়ে খাওয়া যায় এমন তামাকের মধ্যে ৩০০০ রাসায়নিক পদার্থ থাকে যার মধ্যে আছে নাইট্রোসেমিন, পোলেনিয়াম ২১০, আর্সেনিক, নিকেল ও ক্যাডমিয়াম। এগুলো খেলে ওরাল ক্যানসার হওয়ার সম্ভাবনা। এছাড়াও ফুসফুস, পাকস্থলি, প্যাংক্রিয়াস, কিডনি, ব্লাডার, কোলন ও জরায়ুমুখ বা সার্ভিক্স ক্যানসারের সম্ভাবনা থাকে।

ধোঁয়াযুক্ত বিড়ি-সিগারেট জাতীয় তামাক থেকে কী ধরনের ক্যানসার হয় ? তালিকা দীর্ঘ- নাক, সাইনাস, মুখ, গলা, কন্ঠনালী, খাদ্যনালী, ফুসফুস, লিভার, প্যাংক্রিয়াস, পাকস্থলি, কিডনি, ব্লাডার, জরায়ুমুখ, কোলন ও মলাশয়ের সংযুক্ত এলাকায় কোলোরেক্টাল ক্যানসার।

সিগারেটে কী আছে ? আছে নিকোটিন, কার্বন মনোক্সাইড, নাইট্রোজেন অক্সাইড, হাইড্রোজেন সায়ানাইড, অ্যামোনিয়া, আর্সেনিক, তেজস্ক্রিয় পোলোনিয়াম ২১০ ও পটাসিয়াম ৪০। তামাক সেবনের সময়ে অন্তত ৪০০০ ধরনের ক্ষতিকারক যৌগ উৎপাদন হয় যা প্রত্যক্ষভাবে ক্যানসার সৃষ্টি না করলেও শরীরে বিভিন্ন অসুখের সৃষ্টি করে। যেমন হৃৎপিন্ডের অসুখ, সি.ও.পি.ডি.,অ্যাথেরোস্ক্লেরোসিস, করোনারি হার্ট ডিজিজ, অ্যাজমা, কার্ডিওমায়োপ্যাথি, হার্ট ব্লক, কার্ডিওভাসকুলার ডিজিজ, কিডনির অসুখ, রেনাল ফেলিওর, পেপটিক আলসার, বন্ধ্যাত্ব, সিরোসিস, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা হ্রাস, হরমোন ঘটিত অসুখ, তাড়াতাড়ি ছানি পড়া ইত্যাদি।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এক রিপোর্ট, বিদেশে তামাকজাত পণ্যদ্রব্য রপ্তানী করে ভারতের আয় হয়! বছরে ৪০০ কোটি টাকা। পক্ষান্তরে তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহারের কারণে ক্যানসারে আক্রান্ত রোগীর চিকিৎসার জন্য ভারতবাসীর খরচ হয় বছরে ১৪৫০ কোটি টাকা। এই পরিমাণ টাকা ভারতের কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যদপ্তরের বাজেট বরাদ্দের চেয়ে ১২ শতাংশ বেশি।

ষোড়শ শতাব্দীতে ফরাসী জ্যাক নিকোট-এর নাম থেকে নিকোটিন শব্দটির জন্ম। এই নিকোটিন ৫০০০ বছর আগে থেকেই সমাজের বুকে চেপে বসেছে স্টাইল, ফ্যাসন ও স্ট্যাটাসের হাত ধরে ও অভ্যাসের দাস হয়ে। কে প্রথম নেশার হাত ধরে মানুষের কাছে এসেছিল হুকো, বিড়ি, সিগারেট না গাজা তা বলা মুশকিল।

হুকো : নিচের খোলে জল, দন্ডের মাথায় বসানো কলকেতে তামাক। সেই তামাকের ধোঁয়া জলের মধ্যে দিয়ে টানা হয় বলে তামাকের ক্ষতিকারক ক্ষমতা কমে যায় বলে অনেকের ধারণা, যা ঠিক নয়। আগেকার দিনে বর্ধিষ্ণু ব্যক্তির বৈঠকখানায় বামুন-কায়েত-শ্রদ্র প্রভৃতি বিভিন্ন জাতের জন্য আলাদা আলাদা হুকো থাকত। স্বামী বিবেকানন্দ এমনই এক নিচু জাতের জন্য রাখা হুকোয় টান দিয়ে পরীক্ষা করছিলেন কোনখান দিয়ে কীভাবে জাত যায়!

গড়গড় : ছবি বিশ্বাস বা কমল মিত্র, জমিদারের দৃপ্ত গীম্ভীর্যে গড়গড়ার নলে টান দিয়ে উত্তমকুমারকে ধাতানি দিচ্ছেন এ ছবি আমাদের জানা। লম্বা নল দিয়ে ও জলের মধ্য দিয়ে গড়গড়া টানা ক্ষতিকারক নয় বলেও অনেকের ধারণা। ভারত ও মধ্যপ্রাচ্যে হুকোর ব্যবহার চলে আসছে ষোড়শ শতাব্দী থেকে। এখনকার দিনে তা ‘হুক্কা বার’ নামে চালু হয়েছে।

সিগারেট: শুধু সিগারেটের প্যাকেটেই লেখা থাকে বিধিসম্মত সতর্কীকরণ : ধূমপান স্বাস্থের পক্ষে ক্ষতিকর। তামাকপাতা পরিশোধন করে তাতে আরো কিছু মিশিয়ে তা কাগজে মুড়ে সিগারেট তৈরি হয়। একটি সিগারেটের দৈর্ঘ ১২০ সে.মি., ব্যাস ১০ মি.মি.। ফিল্টার দেওয়া সিগারেটে ক্যানসারের সম্ভাবনা কম বলে উৎপাদকরা দাবি করলেও তার কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।

সিগারেট চুরট : তামাকপাতা গুড়িয়ে শক্তপোক্ত পাতায় মুড়ে তৈরি হয় সিগার। মায়া সভ্যতার আমলে এক ধরনের পাত্রে এক বান্ডিল তামাকপাতা তার দিয়ে বেঁধে ‘সিকার’ তৈরি হত। অনেকের ধারণা মায়া সভ্যতার ‘সিকার’ আধুনিক সিগার হয়ে অভিজাত মহলের হাতে হাতে ঘুরছে।১৭৩০ সালে ইংরেজিতে ‘সিগার’ শব্দ যুক্ত হয়।

ই-সিগারেট : অধুনা সিগারেটের নেশা থেকে মুক্তি পেতে ই.সিগারেট চালু হয়েছে। এই ই.সিগারেটের মধ্যে এক ধরনের ই.লিকুইড প্রোপাইলন গ্লাইকল গ্লিসারিন ও নিকোটিনের সঙ্গে ফ্লেভার যুক্ত করা হয়।হরেক রকমের তামাক জাতীয় নেশার দাসত্ব করে, বিড়ি-সিগারেট থেকে পানমশলা, গুড়াখু, খৈনি ইত্যাদি চিবিয়ে ক্যানসারের কবলে পড়ে ভারতের ৩০ থেকে ৬৯ বছর বয়সী ৪২% পুরুষ ও ১৮% মহিলা মারা যায়।

২০১২ সালের ২৮ মার্চ ‘দি ল্যানসেট’পত্রিকায় প্রকাশিত এক নিবন্ধে ভারতীয়দের তামাক সেবন জনিত ক্যানসার মৃত্যু নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে মুখ, পাকস্থলি ও ফুসফুসের ক্যানসার ভারতীয় পুরুষদের মৃত্যুদুত। অন্যদিকে সার্ভিক্স বা জরায়ুমুখ, পাকস্থলি ও স্তনের ক্যানসারে সর্বাধিক মহিলা মৃত্যু হয়। টরেন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্ট মাইকেল হসপিটালের ‘সেন্টর ফর গ্লোবালহেলথ রিসার্চ-এর গবেষক প্রফেসর প্রভাত ঝা’র মতে, ৩০ থেকে ৬৯ বছর বয়সীদের মধ্যে তামাক চিবিয়ে মুখের ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার সংখ্যা ফুসফুসের ক্যানসারে আক্রান্তদের তুলনায় দ্বিগুণের বেশি।

জনগণের তামাক নেশা করার প্রবণতা নিয়ে এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, ধূমপান স্বাস্থ্যের পক্ষে ক্ষতিকারক এই সতর্কীকরণের পরে সিগারেট খাওয়া মানুষের সংখ্যা শতকরা ১৯ থেকে কমে দাঁড়িয়েছে শতকরা ১৬ ভাগ, বিড়ি খাওয়া ছেড়েছে শতকরা ১৮ জন। অন্যদিকে পানমশলা জাতীয় তামাক দ্রব্যের নেশা প্রচন্ডভাবে বৃদ্ধি পেয়ে শতকরা ২৭ থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে শতকরা ৪৮-এ। এই বৃদ্ধির ফলে ৭০% মানুষ ক্যানসারে আক্রান্ত হচ্ছে। সংখ্যার হিসেবে প্রতি বছর ধূমপান জনিত তামাক সেবনের ফলে ক্যানসারে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা ১০ লক্ষ। গুটখা, খৈনি, পানমশলা, পান পরাগের বিক্রি ও ব্যবহার বন্ধ করতে না পারলে ২০২০ সালে মানুষের মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ হবে বিভিন্ন তামাকজনিত মুখগহ্বরের ক্যানসার।

বিশেষজ্ঞের মতে, তামাকজনিত কারণে মুখের ভেতরের ক্যানসারে ভারতের স্থান পৃথিবীর মধ্যে এক নম্বরে।পানপরাগের ক্ষতিকর প্রভাব এড়াতে ইতিমধ্যেই দিল্লি, গোয়া, রাজস্থান, জম্মু-কাশ্মীর, হিমাচল, কেরালা, উত্তরপ্রদেশ প্রমুখ রাজ্য পানপরাগ, গুটখা, জর্দা ইত্যাদি ব্যবহারের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছেন।

১৯৭৫ সালে ভারতের বাজারে প্রথম পানমশলা জাতীয় তামাকের বিক্রি আরম্ভ হয়। এতে আছে আশি ভাগ সুপারি, দশ ভাগ খয়ের, এক ভাগ চুন ও সুগন্ধী মশলা। ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল সায়েন্স অ্যাকাডেমি’র রিপোর্টে সতর্ক করে বলা হয়েছে, বিভিন্ন পানমশার উপাদানগুলো আলাদাভাবে বা মিলিতভাবে জীবদেহের কোষের ভেতরের ক্রোমোজমের ক্ষতি সাধন করে। জিন-এর মিউটেশন ঘটিয়ে ক্যানসারের সংক্রমণ ঘটায়। ইঁদুরের ওপর পানমশলার প্রভাব নিয়ে গবেষণায় এই তথ্য প্রমাণিত।

পানপরাগ, খৈনি, জর্দা, গুটখা প্রমুখ পানমশলা ক্রমাগত চুষে খেতে বা চিবোতে চিবোতে মুখ গহ্বরের শ্লৈষ্মিক ঝিল্লি ক্ষতিগ্রস্ত গয়ে ওরাল সাব মিউকাস ফাইব্রোসিস নামক অবস্থার যা থেকে পরবর্তীকালে ক্যানসার হতে পারে। যে হারে পানমশলা খাওয়ার ধুম বাড়ছে তাতে বিজ্ঞানীদের আশষ্কা আগামী ২০২০ সালে পানমশলা জাতীয় তামাক সেবনের কারণে ক্যানসার মহামারির আকার দেখা দেবে।

বিড়ি-সিগারেট উৎপাদক লবির মতো পানমশলা-তামাক উৎপাদক লবিও মহাশক্তিশালী। পানমশলার মূল উপাদান তামাক উৎপাদন করে ভারতের ২২টি রাজ্য। তাদের রাজনৈতিক চাপে তামাকচাষীদের ক্ষুদ্র স্বর্থ রক্ষঅ করতে জনসাধারণের বৃহত্তর স্বার্থ উপেক্ষা করার জনস্বাস্থের বিপদ ঘনাচ্ছে।মানুষকে সচেতন করতে না পারলে মানুষ নিজ থেকে পানমশলার বিরুদ্ধে অসহযোগিতা না করলে স্বেচ্ছা আরোপিত ক্যানসার থেকে সমাজের মুক্তি নেই। কারণ তামাকের বিকল্প ক্ষতিহীন নেশার সন্ধান আজও পাওয়া যায়নি।

পরিশেষে একটা শুভ সংবাদ হল ভারত সরকার সিগারেটের প্যাকেটের ৬৫ শতাংশে ক্যানসার নিয়ে বিধিসম্মত সতর্কীকরণের পক্ষে নির্দেশ দিয়েছে সংসদীয় কমিটির চেয়ারম্যানের সুপারিশ অগ্রাহ্য করে।








Leave a reply