রেচনতন্ত্র, কিডনি রোগ এবং কিডনি ভালো রাখার উপায়

|

মানবদেহের রেচন প্রক্রিয়া শরীরবৃত্তীয় বিভিন্ন প্রক্রিয়ার মধ্যে সবচেয়ে জটিল বিষয়গুলোর একটা। এই জৈবিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দেহে বিপাক প্রক্রিয়ায় উৎপন্ন নাইট্রোজেন ঘটিত বর্জ্য পদার্থ বের করে দেয়া হয়। এই বর্জ্য পদার্থগুলো মানবদেহের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। এই পদার্থগুলো যদি রেচন প্রক্রিয়ায় বের করে দেয়া না যায় মানুষের মৃত্যু অনিবার্য। কি গায়ে কাটা দিয়ে উঠলো নাকি?!! কাটা দেয়ার মত বিষয় হলেও এটা সত্যি। এমন অনেক উদাহরণ আছে, মানুষ মারা গেছে শুধুমাত্র মুত্র ত্যাগ না করতে পারার কারণে। আসুন আগে জেনে আসি রেচনতন্ত্র সম্পর্কে।

রেচনতন্ত্র: সোজা কথায় যে তন্ত্রের মাধ্যমে দেহের বিষাক্ত পদার্থ বের করে দেয়া হয় তাকে বলে রেচনতন্ত্র। শরীরের অতিরিক্ত পানি,লবন এবং জৈব পদার্থগুলো রেচনের মাধ্যমে বের করে দিয়ে বৃক্ক বা কিডনী দেহের শারীরবৃত্তীয় ভারসাম্য রক্ষা করে। মানবদেহের রেচন অঙ্গ হলো বৃক্ক। আর বৃক্কের এককের নাম নেফ্রন।

রেচনপদার্থ : নাইট্রোজেন ঘটিত বর্জ্য পদার্থকে রেচন পদার্থ বোঝায়। মুত্রত্যাগ করার মাধ্যমে শরীর থেকে প্রানীর দেহের অতিরিক্ত পানি বেড়িয়ে আসে।মুত্রের ৯০ ভাগ উপাদানই পানি। ইউরিয়া,ইউরিক এসিড ক্রিয়েটিনিন ও লবন মিলে পূরন করে বাকী ১০ ভাগ। মানুষের মুত্রের রঙ হলুদ হলে ধারণা করা হয় সে জন্ডিসে আক্রান্ত। এটা যেমন সত্য তেমনি সত্য ইউরোক্রোম নামক একধরনের রঞ্জক পদার্থ মুত্র হলুদ হওয়ার জন্য দায়ী।

বৃক্ক: কথায় আছে বাংলা সিনেমায় নায়ক তার ধনী প্রেমিকার জীবন বাচাতে নিজের কিডনি দান করে দেয়। তবে সত্যটা হচ্ছে এই কিডনীর প্রয়োজনীয়তা জানলে নায়ক হয়তো পুরো পৃথিবী এনে দিলেও কিডনী দান করতো না। মানবদেহের কিডনীর সংখ্যা দুটি। মেরুদণ্ডের দুটিকে বক্ষপিঞ্জরের নিচে এদের অবস্থান। বৃক্কের বাইরের প্বার্শ উত্তল এবং ভিতরের প্বার্শ অবতল। অবতল অংশের ভাজকে বলে হাইলাস। প্রতিটি বৃক্কে বিশেষ ধরনের এক ধরনের নালিকা থাকে,যাকে বলে ইউরিনিফেরাস নালিকা। এই নালিকা,নেফ্রন এবং সংগ্রাহী নালিকা দুটি প্রধান অংশে বিভক্ত। নেফ্রন মুত্র তৈরি করে আর সংগ্রাহী নালিকা রেনাল পেলভিসে মুত্র বহন করে। একজন স্বাভাবিক মানুষ প্রতিদিন প্রায় ১৫০০ মিলিলিটার মুত্র ত্যাগ করে। মুত্রে ইউরিয়া,ইউরিক এসিড, অ্যামোনিয়া এবং ক্রিয়েটিনিন থাকে। বৃক্কের ভিতরের একটি নেফ্রন জটিল প্রক্রিয়ায় মুত্র উৎপন্ন করে। উৎপন্ন মুত্র সংগ্রাহী নালিকার মাধ্যমে বৃক্কের পেলভিসে পৌছায় এবং পেলভিস থেকে ইউরিটারে প্রবেশ করে।ইউরেটার থেকে মুত্র মুত্রথলিতে এসে সাময়িকভাবে জমা হয়। এভাবে নির্দিষ্ট একটা সময়ে মুত্র ত্যাগের ইচ্ছা জাগে এবং মানুষ মুত্র ত্যাগ করে।

বৃক্কের বিভিন্ন রোগ : মানুষের কিডনীতে ছোট আকারের পাথর জাতীয় পদার্থের উপস্থিতিই বৃক্ক পাথর নামে পরিচিত। প্রাথমিক ভাবে বৃক্কে পাথর হলে তেমন সমস্যা ধরা পড়ে না। বৃক্কে পাথর হলে একটা সময় প্রস্রাবে বাধা আসে এবং কোমরের পিছনের দিকে ব্যাথা হয়। অনেক সময় কাপুনি দিয়ে জ্বর আসে। সাধারণত অধিক পানি পান এবং ঔষধ সেবনে বৃক্কে পাথরের চিকিৎসা করা যায়। তবে নাগালের বাইরে চলে গেলে ইউরেটারোস্কোপিক অথবা অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে পাথর অপসারণ করা যায়। নেফ্রাইটিস,ডায়াবেটিস এবং হাইপ্রেসারের কারণে কিডনী বিকল হতে পারে। হঠাৎ করে প্রস্রাবের পরিমাণ ও সংখ্যার পরিবর্তন বিশেষ করে রাতে বেশি প্রস্রাব হওয়া, প্রস্রাবে অতিরিক্ত ফেনা হওয়া, প্রস্রাবের সঙ্গে রক্ত এবং প্রোটিন যাওয়া, প্রস্রাবে জ্বালাপোড়া করা ও অস্বাভাবিক গন্ধ হওয়া, রক্তশূন্যতা বেড়ে যাওয়া, মাথাব্যথা ও শরীর চুলকানো, বমি বমি ভাব, প্রস্রাবের সঙ্গে পাথর বের হওয়া, হাত, পা মুখসহ সমস্ত শরীর ফুলে যাওয়া ইত্যাদি কিডনি রোগের প্রধান লক্ষণ।

কিডনি ভালো রাখার উপায় : শিশুদের টনসিল এবং খোসপাঁচড়া থেকে কিডনীর রোগ হতে পারে। তাই এসব ক্ষেত্রে সবসময় সতর্ক থাকতে হবে। ডায়াবেটিস এবং রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। ডায়রিয়া ও রক্তক্ষরণ ইত্যাদির দ্রুত চিকিৎসা করতে হবে। নিয়মিত ব্যায়াম করতে হবে। একাধারে বেশিদিন ব্যথার ঔষধ খাওয়া যাবে না। ধুমপান ত্যাগ করতে হবে এবং প্রচুর পরিমানে পানি পান করতে হবে। যথাসম্ভব সবুজ শাকসবজি এবং ভিটামিন -সি গ্রহন করতে হবে।








Leave a reply