জেনে নিন বেশি ঘুমানোর কিছু ক্ষতিকর দিক

|

আমাদের জীবনে কিছু ভালো অভ্যাস থাকে আর থাকে কিছু খারাপ অভ্যাস। বলাই বাহুল্য, জীবনযাপনের পথে মস্ত বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায় খারাপ অভ্যাস। আমি খারাপ অভ্যেস তৈরি করে ফেলেছি যা আমার ক্ষতি করছে- এই বোধ এলে অনেকে সরেও দাঁড়ান। কিন্তু মুশকিল হল কিছু কিছু বিষয় থাকে যা আপাতদৃষ্টিতে ততটাও খারাপ বলে মনে হয় না। তাই পরে যখন বোঝা যায়, তখন অনেকটাই দেরি হয়ে যায়। রইল সেরকমই কয়েকটি খারাপ অভ্যাসের তালিকা যা ধীরে ধীরে নানা সমস্যার জন্ম দেয়।

অপর্যাপ্ত ঘুম

আগের রাত্রে ভালো করে ঘুম না হলে পরের দিন শরীর অত্যন্ত ক্লান্ত থাকে। দেখা দেয় মানসিক অস্থিরতাও। বিশেষজ্ঞরা বলছেন একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষের সারা দিনে অন্তত ছয় ঘণ্টা ঘুমের প্রয়োজন হয়। এর চেয়ে কম ঘুম হলে সেটা প্রভাব ফেলে রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা, শ্বাসযন্ত্র ও পাচনতন্ত্রে।

বেশি করে পশুজাত প্রোটিন খাওয়া

বেশি মাত্রায় চিজ ও মাংস খেলে তার থেকে ক্যানসার হওয়ার আশঙ্কা থাকে। কারণ এগুলো বেশি খেলে আইজিএফ১ বলে একটি হরমোন নিঃসৃত হয়। বেশি করে সিগারেট খেলে যেমন ক্ষতি হয়, এক্ষেত্রেও ঠিক তেমনই হয়।

বেশিক্ষণ বসে কাজ করা

অফিস হোক বা বাড়ি, সারাক্ষণ চেয়ারে বসে কাজ করলে তার ফল হয় মারাত্মক। বেশিক্ষণ বসে থাকলে সেটা ধীরে ধীরে ফুসফুস, স্তন ও কোলোনের ক্যানসার তৈরি করতে পারে। প্রতি দুই ঘণ্টা অন্তর চেয়ার থেকে উঠে একটু ঘোরাঘুরি করা উচিত।

একাকিত্বের চাপ

একা থাকা একরকম আর সবার মাঝে থেকেও একাকিত্বের মুখোমুখি হওয়া আরেক রকম। একাকিত্বও যে জীবনে বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে সেটা অনেকেই বিশ্বাস করেন না। একাকিত্ব থেকে মানসিক অস্থিরতা, অনিয়ন্ত্রিত আবেগ, বিভিন্ন খারাপ জিনিসের নেশা ইত্যাদি হতে পারে। এর একমাত্র উপায় হল ভালো বন্ধু তৈরি করা।

ঘরের মধ্যে থেকে ট্যানিং করা

অনেকেই আজকাল সূর্যের আলো এড়িয়ে ঘরের মধ্যে ট্যানিং করছেন। সূর্যের আলোয় ত্বকের অনেক ক্ষতি হয় ঠিকই কিন্তু ইনডোর ট্যানিংও কম ক্ষতিকর নয়। স্থানীয় ট্যানিং সালঁতে না গিয়ে কিছুক্ষণ রোদে থাকার চেষ্টা করা উচিত!

বেশি ঘুমের কারণে শরীরে ডায়াবেটিস এবং হার্টের বড় ধরনের সমস্যা হতে পারে। তাছাড়া এতে মৃত্যুঝুঁকিও বেড়ে যায়। সুস্থ থাকার জন্য চিকিৎসরা বরাবরই একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষকে ৭-৮ ঘণ্টা ঘুমানোর পরামর্শ দেন।

গবেষণায় দেখা গেছে, কম ঘুমানোর কারণে কর্মদক্ষতা কমে যাওয়ার পাশাপাশি বিষণ্নতা জেঁকে বসে। তাই সুস্থ থাকতে পরিমিত ঘুমের কোনো বিকল্প নেই।

মার্কিন গবেষণা থেকে জানা গেছে, কম ঘুম ও অতিরিক্ত ঘুম উভয়ের ফলে হৃদরোগ, স্থুলতা, উদ্বেগসহ নানাবিধ সমস্যা দেখা দেয়। এছাড়া ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপের আশঙ্কাও বেড়ে যায়।

প্রায় ৫০ হাজার মানুষের ওপর গবেষণা চালিয়ে দেখা যায়, অপর্যাপ্ত ঘুম মানুষের শারীরিক ও মানসিক উভয় দিকে বেশি প্রভাব ফেলে। এর কারণে কার্ডিও ভাসকুলার ডিজিজ ও ওবেসিটি দেখা দেয়। এসব সমস্যা অবশ্য পর্যাপ্ত ঘুমের মাধ্যমে দূর করা সম্ভব। আবার ঘুমের মাত্রা বেশি হলে হৃদরোগ, স্থূলতা, উদ্বেগ নানাবিধ সমস্যা দেখা দেয়।

ঘুমের কারণে মানুষের যা হতে পারে:

  • বেশি ঘুমের কারণে আপনার শরীরে বাসা বাঁধতে পারে ডাাঁবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ।
  • বেশি ঘুমের কারণে কোমরে, পিঠে যন্ত্রনা হতেও দেখা যায় অনেকের।
  • মানসিক অবসাদে থাকা মানুষ অনেক সময় বেশি ঘুমায়। বেশি ঘুমে মানসিক অবসাদ আরও বেড়ে যায়।
  • অতিরিক্ত ঘুমে হার্ট অ্যাটাকের প্রবণতা দ্বিগুণ বাড়ায়। তাই ওভারস্লিপিংয়ের অভ্যস থাকলে আজই তা ত্যাগ করুন।
  • যাদের বেশি সময় ধরে ঘুমের অভ্যাস, একদিন কম ঘুমালেই, তাদের মাথা যন্ত্রণার মতো সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়।
  • দীর্ঘক্ষণ শোয়ার ফলে হাঁটা-চলা বা কোনো রকম মুভমেন্ট হয় না, ফলে মেদ বাড়ার সম্ভাবনা বেশি।
  • খুব কম বা খুব বেশি সময়ের ঘুম মস্তিষ্কের কাজ করার ক্ষমতা হ্রাস করে।
  • নারীরা পাঁচ ঘণ্টার কম অথবা ৯ ঘণ্টার বেশি সময় ধরে নিয়মিত ঘুমালে দুই বছরে তাদের মগজের কর্মক্ষতা কমে যেতে পারে।

আহা! আজ যদি সারা দিন ঘুমাতে পারতাম, ছুটির দিনে এমনটা মনে হয়। অফিস কিংবা কাজে যাওয়ার তাড়া থাকায় অন্য দিনগুলোতে বেশ ভোরে উঠতে হয় অনেককে। কেউ কেউ মনে করেন, আট ঘণ্টার ঘুমটাও পর্যাপ্ত নয় তাঁর জন্য। আরেকটু ঘুমানো গেলে বেশ হতো। বাড়তি ঘুম নিয়ে এই যে হাপিত্যেশ, আসলে তা করার দরকার নেই। গবেষণায় দেখা গেছে, বাড়তি ঘুম শরীরের জন্য ভালো নয়। সাপ্তাহিক ছুটির দিনেও বেশি ঘুমানো ঠিক নয়। অল্প ঘুম হলেও যেমন সমস্যায় পড়তে হয়, তেমনি অতিরিক্ত ঘুমও শরীরে নানা ঝক্কি বয়ে আনে।

অতিরিক্ত ঘুমাচ্ছেন কীভাবে

আপনি হয়তো ১০-১১ ঘণ্টাই ঘুমাচ্ছেন, কিন্তু আপনার কাছে মনে হচ্ছে না অতিরিক্ত ঘুম। বরং ভাবছেন, ২৪ ঘণ্টা ঘুমাতে পারলে ভালো লাগত। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল স্লিপিং ফাউন্ডেশন সাম্প্রতিক সময়ে তাঁদের একটি গবেষণায় বলেছে, ১৮ থেকে ৬৪ বছর বয়সী একজন মানুষের সুস্থ থাকার জন্য সাত থেকে নয় ঘণ্টা ঘুমই যথেষ্ট। যুক্তরাষ্ট্রের অ্যারিজোনা স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক শন ইয়ংস্ট্যাড্ট ওয়াল স্ট্রিট জার্নালে বলেছেন, সর্বোচ্চ বা সর্বনিম্ন যা-ই হোক, সাত ঘণ্টার বেশি ঘুম ঠিক নয়। অন্যান্য গবেষণারও মিল পাওয়া যায় এর সঙ্গে। দেখা যায়, মস্তিষ্কের সুস্থতার জন্য সাত ঘণ্টা ঘুমই পর্যাপ্ত।

কারও কাছে যদি মনে হয়, সাত ঘণ্টা একটু কম হয়ে যাচ্ছে। মাথা ঘোরাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা তাহলে আরও এক ঘণ্টা ঘুমানোর অনুমতি দেন। কিন্তু কোনোভাবেই এর বেশি নয়। ছুটির দিনে আরেকটু বেশি ঘুমালে কোনো অসুবিধা নেই; তা-ও নয় ঘণ্টার বেশি নয়। যুক্তরাষ্ট্রের ২ শতাংশ মানুষের ছোটবেলা থেকে দেরি করে ঘুম ওঠার অভ্যাস। রোগব্যাধি তাদের শরীরে বেশি হয়।

বেশি ঘুমালে কী হয়

ভালো ঘুম হলে চেহারা সুন্দর হয়, এটা যেমন ঠিক; আবার বেশি ঘুমাতে গিয়ে যেসব রোগে আক্রান্ত হতে পারেন।

l শারীরিক বৈকল্য

l বিষণ্নতা

l অতিরিক্ত প্রদাহ

l প্রজনন ক্ষমতা কমে যাওয়া

l শরীরে অতিরিক্ত ব্যথা অনুভূতি

l স্থূলতা

l হৃদ্‌যন্ত্রের সমস্যা

l ডায়াবেটিস বেড়ে যাওয়া

কীভাবে ঘুমের ঘড়ি ঠিক রাখবেন

‘স্লিপ সাউন্ডলি এভরি নাইট, ফিল ফ্যানটাসটিক এভরি ডে’—আ ডক্টর’স সল্যুশন টু সলভিং ইওর স্লিপ প্রবলেমস বইয়ের লেখক ও বিখ্যাত ঘুমের ওষুধ বিশেষজ্ঞ ডা. রবার্ট রোসেনবার্গ এ বিষয়ে কিছু পরামর্শ দিয়েছেন।

l সাত-আট ঘণ্টার পর্যাপ্ত ঘুম ঘুমাতে হবে।

l ঘরে ভারী পর্দা ব্যবহার না করা ভালো; যাতে দিনের প্রথম রোদ ঘরে ঢুকতে পারে।

l মৃদু শব্দে অ্যালার্ম দিয়ে রাখতে হবে। প্রতিদিন একই সময়ে ঘুমানো এবং ওঠার অভ্যাস করতে হবে। চেষ্টা করতে হবে ছুটির দিনেও এই নিয়ম মেনে চলার।

l বিকেল চারটার পর হালকা ঘুমানো বা ন্যাপ নেওয়া উচিত নয়।

l দিনের বেলা হাঁটাচলা করলে রাতে সময়মতো ঘুম আসবে। তাতে সাত ঘণ্টা ঘুমালেও ঝরঝরে লাগবে নিজেকে।








Leave a reply