কে ঘোঁচাবে বেদে সম্প্রদায়ের দুঃখ-দুর্দশা ? সরকার নাকি জনগণ?

|

ও বাবু সেলাম বারে বার, আমার নাম গয়া বাইদ্যা বাবু, বাড়ি পদ্মা পার। এক ঘাটেতে রান্ধি-বাড়ি মোরা আরেক ঘাটে খাই, মোদের বাড়ি ঘর নাই।’- বিখ্যাত পল্লীকবি জসীমউদ্দিনের কবিতার এই লাইনগুলো শুনলে মনে পড়ে যায় বেদে সম্প্রদায়ের কথা। মানসপটে ভেসে উঠে বেদে সম্প্রদায়েরর নানাবিধ চিত্র, যাদের প্রধান পেশা হলো সাপ খেলা দেখানো, ঝাড়ফুঁক দেওয়া ইত্যাদি। তারা বছরের প্রায় ৮ মাসই নৌকায় বসবাস করে থাকে, স্থায়ীভাবে কোথাও বসবাস করার সুযোগটা তারা এখনও পায়নি। কারন সেই আদিকাল থেকেই তাদের জীবনযাপন যাযাবর হয়ে ।

সময়টা ১৬৫০ খ্রিষ্টাব্দের মাঝামাঝিতে আরাকান থেকে রাজা বল্লাল সেনের সাথে এ দেশে পাড়ি জমিয়েছিল তারা। আশ্রয় নিয়েছিলো বিক্রমপুরে, সেখান থেকেই ধীরে ধীরে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে তারা। এখন বাংলাদেশে বেদে সম্প্রদায়ের সংখ্যা প্রায় ৮ লাখ, যারা এখনও নৌকায় জীবনযাবন করছে। মানুষ হিসেবে বেঁচে থাকার অধিকারকে বলা হয় মানবাধিকার। আর তাদের এই মানবাধিকারকে কেড়ে নেওয়া হচ্ছে ধীরে ধীরে। মানুষ হিসেবে বেঁচে থাকার জন্য যা প্রয়োজন তা তাদের নেই। প্রথমত, তাদের দরকার স্থায়ী জায়গা, যেখানে তারা বসবাস করতে পারে, এমনকি তাদের পরের প্রজন্মও বসবাস করবে।

২০০৮ সালে তাদেরকে ভোটাধিকার দেওয়া, তখন থেকে তারা বাংলাদেশের নাগরিক হিসাবে গণ্য হয়েছে। বাংলাদেশের সকল আইনের প্রধান হলো ১৯৭২ সালের বাংলাদেশের সংবিধান। সেই সংবিধানের ৪৪ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, নাগরিকদের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করার কথা। মৌলিক অধিকার বলতে যেটা বুঝি (খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা , শিক্ষা) এগুলোর কোন একটাও তাদের জন্য নিশ্চিত করতে পারেনি সরকার। সম্পত্তির অধিকার (অনুচ্ছেদ-৪২) সংবিধানে থাকা স্বত্বেও তাদের সামান্য বসবাস করার জায়গাটাও নেই।

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক ২০১৩ সালে, দলিত, হরিজন ও বেদে জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তববায়ন নীতিমালা গ্রহণ করা হয়েছিলো তা এখনও বাস্তববায়ন করা হয়নি। এটা কি সরকারের ব্যর্থতা নাকি সরকারি আমলাগণের অবহেলা!

প্রায় ৪০০ বছরেও তাদের জীবন মান উন্নত হয়নি? সমাজের উঁচু শ্রেনির মানুষের কাছে, তারা সব সময় সর্বক্ষেত্রে অবহেলিত হচ্ছে। তাদের কোন নিজস্ব স্বাধীনতা নেই। বেসরকারী বা ব্যক্তিগত ভাবে কোন সাহায্য পেলেও পরিমানটা খুবই সামান্য। মাত্র ২.৫ শতাংশ গর্ভবতী মহিলা এবং শিশু সরকারি ভ্যাকসিন পায়, যার ফলে অনেক মহিলা গর্ভাবস্তায় মারা যায়, শিশুরা হয় বিকলাঙ্গ।

প্রায় ২.৮ একর খাস জমি বেদখল করে সমাজের ক্ষমতাধর ব্যক্তিরা। সরকার একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্প গ্রহণ করেছিলেন। এমনকি হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় করে বাস্তুহীনদের জন্য ঘর করে দিয়েছেন কিন্তু সেখানেও জায়গা হয়নি তাদের, তাহলে সেই ঘরে বসবাস করছে কারা? ঝড়-বৃষ্টি বা ঘূর্ণিঝড় যে দূর্যোগই হোক না কেন তাদের আশ্রয় নিতে হয় নৌকায়, ছুটে চলতে হয় এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে। অনেক সময় আশ্রয়কেন্দ্রে যাওয়ারও সুযোগ থাকেনা। ইতোমধ্যে কিছুসংখ্যকের থাকার ব্যাবস্থা করতে পেরেছে সরকার।

সরকার কি ২০৩০ সালের মধ্যে বেদে সম্প্রদায়ের জীবনের দুঃখ-দুর্দশার সাতকাহন ঘোঁচাতে সক্ষম হবে এবং দারিদ্র্যমুক্ত দেশ গড়ার লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে পারবে কি? সরকারকে গ্রহণ করতে হবে কঠোর উদ্যোগ, যেখানে দূর্নীতি বা প্রতারণা করার কোন সুযোগ থাকবে না।








Leave a reply