এটা কী বললেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী

|

১৫ আগস্ট শনিবার জাতীয় শোক দিবস পালন উপলক্ষে রাজধানীতে এক দোয়া মাহফিল ও আলোচনা অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের নির্দেশনা অনুযায়ী দেশের চিকিৎসক, নার্স, টেকনোলজিস্টরা নিরলস কাজ করে গেছেন। এর ফলে করোনা আজ আমাদের দেশ থেকে বিদায় নেওয়ার পথে।’ আমাদের বিবেচনায় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর এই বক্তব্য বাস্তবতার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ এবং সে কারণে অগ্রহণযোগ্য। শুধু তা-ই নয়, সারা দেশে যখন কোভিড-১৯ রোগীর সংখ্যা প্রতিদিন বেড়ে চলেছে, সেই সময়ে স্বয়ং স্বাস্থ্যমন্ত্রীর এমন অবাস্তব বক্তব্যে দায়িত্ববোধের অভাবও প্রতীয়মান হয়েছে।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী যেদিন বলেছেন করোনাভাইরাস এই দেশ থেকে বিদায় নেওয়ার পথে, তার আগের ২৪ ঘণ্টায় সংক্রমণের হার ছিল ২০ দশমিক ৫১ শতাংশ। ওই সময়ে ১২ হাজার ৮৯১ জনের নমুনা পরীক্ষা করে রোগী শনাক্ত হয়েছেন ২ হাজার ৬৪৪ জন। মৃত্যুর সংখ্যা রেকর্ড করা হয়েছে ৩৪। কিন্তু তার আগের ২৪ ঘণ্টায় মারা গেছেন ৪৪ জন। তার আগের ২৪ ঘণ্টায়ও মৃত্যুর সংখ্যা ছিল ৪০-এর ওপরে। দৈনিক নমুনা পরীক্ষার সংখ্যা কমানোর ফলে শনাক্ত রোগীর সংখ্যা কম হচ্ছে। কিন্তু সংক্রমণের হার এখনো ২০ শতাংশের ওপরেই রয়ে গেছে। সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টার যে হিসাব গতকাল পাওয়া গেল তাতে দেখা যাচ্ছে, এক দিনেই পরীক্ষার সংখ্যা ২ হাজার ৮০০-এর বেশি কমানো হয়েছে। কিন্তু তাতে শনাক্ত রোগীর সংখ্যা কম হলেও সংক্রমণের হার সেভাবে কমেনি।

বিশেষজ্ঞরা বলে আসছেন, প্রতি ৫ জনের নমুনা পরীক্ষা করে ১ জন রোগী শনাক্ত হলে, অর্থাৎ সংক্রমণের হার ২০ শতাংশ হলে সেটা মহামারির উদ্বেগজনক প্রবণতার ইঙ্গিত। এ রকম পরিস্থিতিতে দিনে ন্যূনতম ২০ হাজার নমুনা পরীক্ষা করা হলে সংক্রমণের প্রকৃত চিত্র সম্পর্কে মোটামুটি সঠিক ধারণা পাওয়া যেতেই পারে। কিন্তু আমাদের দেশে শুরু থেকেই পরীক্ষা কম করা হয়েছে এবং পরের দিকে তা কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রীর ওই বক্তব্যের পরের দিনই দেখা গেল, আগের ২৪ ঘণ্টার তুলনায় পরের ২৪ ঘণ্টায় পরীক্ষার সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। এটা কি স্বাস্থ্যমন্ত্রীর বক্তব্যের একটা ফল? তা যদি হয়, তাহলে আগামী দিনগুলোতে সরকারিভাবে শনাক্ত রোগীর সংখ্যা কম হবে, কিন্তু বাস্তবে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা অনেক বেশি হবে। কিন্তু কত বেশি হবে, তা বোঝার কোনো উপায় আর থাকবে না।

করোনাভাইরাস বাংলাদেশ থেকে বিদায় নিতে চলেছে—স্বাস্থ্যমন্ত্রী কী বাস্তবতার ভিত্তিতে এই কথা বলেছেন তা পরিষ্কার নয়। কারণ, সরকারি তথ্যেই স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে, সংক্রমণের হার উচ্চই রয়ে গেছে। ঢাকার বাইরে বিভিন্ন এলাকায় সংক্রমণ আগের তুলনায় অনেক বেশি বেড়েছে। শনাক্ত রোগীর তুলনায় মৃত্যুর হার তুলনামূলকভাবে কম—শুধু এই তথ্যের ওপর ভর করেই এটা বলা যায় না যে করোনাভাইরাস এই দেশ থেকে বিদায় নিতে যাচ্ছে। কিংবা বলা যায় না ‘ভ্যাকসিন ছাড়াই দেশ এখন স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরার পথে।’ বস্তুত, যেসব দেশ কঠোর লকডাউন ও আনুষঙ্গিক স্বাস্থ্যবিধি ভালোভাবে বাস্তবায়নের মাধ্যমে সংক্রমণরেখা নিম্নমুখী করতে সক্ষম হয়েছে, তারাও কেউ এমন কথা বলছে না। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও বলছে না বিপদ কেটে গেছে।

স্বাস্থ্যমন্ত্রীর উক্তির সবচেয়ে ঝুঁকির দিকটি হলো এ থেকে জনসাধারণের কাছে এই বার্তা চলে যেতে পারে যে এখন আর সামাজিক দূরত্ব ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার প্রয়োজন থাকছে না। এ ক্ষেত্রে ইতিমধ্যে শিথিলতা চলে এসেছে, তা আরও ব্যাপক হতে পারে। সেটা হলে আমাদের সামনে বড় বিপদ অপেক্ষা করছে। সংক্রমণ বেড়ে সারা দেশের করোনা পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ ধারণ করতে পারে।








Leave a reply